উত্তর আফ্রিকায় ইসলামি শক্তির পুনর্জাগরণ: উসমানীয় ও সাদী রাজবংশের
ঐক্যবল (১৫০০-১৭০০)
১৬শ এবং ১৭শ শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকা ছিল বিশ্ব রাজনীতির এক উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে ভূমধ্যসাগরের একচ্ছত্র অধিপতি উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্য, অন্যদিকে মরক্কোর স্বাধীনচেতা সাদী (Saadi) রাজবংশ। এই দুই শক্তির উত্থান, সংঘাত এবং ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ আফ্রিকার ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছিল।
১. উসমানীয়দের জয়যাত্রা ও বারবারী উপকূলের উত্থান
১৫১৭ সালে সুলতান সেলিম যখন মিশর জয় করেন, তখন থেকেই উত্তর আফ্রিকায় উসমানীয়দের প্রভাব শুরু হয়। পরবর্তীতে সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের সময় হাইরেদ্দিন বারবারোসার মতো দক্ষ নৌ-সেনাপতিদের সহায়তায় আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং লিবিয়া উসমানীয় খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়। উসমানীয়রা এই অঞ্চলে কেবল শাসনই করেনি, বরং ভূমধ্যসাগরকে একটি 'মুসলিম হ্রদে' পরিণত করেছিল।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা: প্রেভেজার যুদ্ধ (১৫৩৮)
এই যুদ্ধে উসমানীয় নৌবাহিনী পোপের নেতৃত্বে গঠিত সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনীকে পরাজিত করে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকার উপকূলীয় শহরগুলো শক্তিশালী নৌ-ঘাঁটিতে পরিণত হয়, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির গতিরোধ করেছিল।
২. সাদী রাজবংশের উত্থান ও মরক্কোর বীরত্ব
যখন উত্তর আফ্রিকার বাকি অংশ উসমানীয়দের বশ্যতা স্বীকার করে নিচ্ছিল, তখন মরক্কোতে সাদী রাজবংশ এক অনন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা নিজেদের মহানবী (সা.)-এর বংশধর হিসেবে দাবি করে পর্তুগিজ ও স্পেনীয় দখলদারদের বিরুদ্ধে 'জিহাদ' ঘোষণা করেন। সাদী সুলতানরা অত্যন্ত কুশলী ছিলেন; তারা একদিকে আধুনিক কামান ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শুরু করেন, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ জাগিয়ে তোলেন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা: তিন রাজার যুদ্ধ (১৫৭৮)
মরক্কোর ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। পর্তুগালের রাজা সেবাস্টিয়ান মরক্কো দখলের উদ্দেশ্যে বিশাল বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলে সাদী সুলতান আব্দুল মালিকের বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। যুদ্ধে পর্তুগিজ রাজাসহ তিন জন রাজা প্রাণ হারান। এই বিজয় পর্তুগালের বিশ্বশক্তি হিসেবে পতনের সূচনা করে এবং মরক্কোকে ইউরোপীয়দের কাছে একটি অজেয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
৩. আহমদ আল-মনসুরের স্বর্ণযুগ ও সাহারা বিজয়
তিন রাজার যুদ্ধের পর ক্ষমতায় আসেন আহমদ আল-মনসুর। তার সময় মরক্কো শিল্প, স্থাপত্য এবং সামরিক শক্তিতে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল আত্মরক্ষা নয়, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য নতুন ভূমি দরকার।
উল্লেখযোগ্য ঘটনা: সোংহাই সাম্রাজ্য অভিযান (১৫৯১)
আল-মনসুর তার 'পাসিল' বাহিনীকে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে দক্ষিণে পাঠান। তোন্দিবি’র যুদ্ধে তারা তৎকালীন শক্তিশালী সোংহাই সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে। এর ফলে সাহারার স্বর্ণ ও লবণের বাণিজ্য মরক্কোর নিয়ন্ত্রণে আসে এবং মারাক্কেশ শহরটি প্রাচুর্যে ভরে ওঠে। এ কারণেই তাকে ইতিহাসে 'আল-ধাহাবি' (স্বর্ণজয়ী) বলা হয়। মারাক্কেশের বিখ্যাত 'এল বাদি প্রাসাদ' এই স্বর্ণযুগেরই সাক্ষ্য বহন করে।
৪. দুই শক্তির দ্বৈরথ ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য
উসমানীয়রা বারবার মরক্কোকে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। ১৫৫১ থেকে ১৫৮০ সালের মধ্যে বেশ কয়েকবার উসমানীয় ও সাদী বাহিনীর মধ্যে 'ফেজ' এবং 'তলেমসান' সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে। তবে দুই পক্ষই শীঘ্রই বুঝতে পারে যে, একে অপরের সাথে যুদ্ধ করার চেয়ে খ্রিস্টান ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকাই দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য ভালো। এই দুই মুসলিম শক্তির মধ্যকার 'কৌশলগত ভারসাম্য' উত্তর আফ্রিকাকে প্রায় ৩০০ বছর সরাসরি ইউরোপীয় উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিস্তার ও প্রভাব
১৬শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল—মিশর থেকে আলজেরিয়া পর্যন্ত—উসমানীয় খিলাফতের অধীনে চলে আসে।
প্রশাসনিক কাঠামো: উসমানীয়রা সরাসরি শাসনের পরিবর্তে 'বেলারবে' বা 'পাশা'দের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করত। তিউনিসিয়া, লিবিয়া (ত্রিপোলি) এবং আলজেরিয়া ছিল মূলত উসমানীয় নৌ-শক্তির প্রধান ঘাঁটি।
ভূমধ্যসাগরীয় আধিপত্য: উসমানীয় নৌ-সেনাপতিরা (যাদের অনেকে ইউরোপীয় ইতিহাসে 'বারবারী জলদস্যু' নামে পরিচিত) ভূমধ্যসাগরে খ্রিস্টান ইউরোপীয় শক্তির গতিরোধ করে রেখেছিল। এটি উত্তর আফ্রিকাকে উসমানীয়দের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সামরিক ফ্রন্টে পরিণত করে।
সাংস্কৃতিক প্রভাব: এই সময়ে কায়রো, তিউনিস এবং আলজিয়ার্স ইসলামি স্থাপত্য, আইন এবং শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। উসমানীয়দের হাত ধরেই এই অঞ্চলে আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সামরিক প্রযুক্তির সূচনা ঘটে।
৫. পতন ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
১৭শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, প্লেগ মহামারী এবং উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বে সাদী রাজবংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৬৫৯ সালে আলাউয়ি রাজবংশের উত্থানের মাধ্যমে তাদের পতন ঘটে। অন্যদিকে, উসমানীয়দের কেন্দ্রীয় শাসন বা ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়লে আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার স্থানীয় 'দে' (Dey) শাসকরা অনেকটা স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা শুরু করেন।
উসমানীয় ও সাদী রাজবংশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কেবল সীমানা জয়ের নায়ক ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন আধুনিক উত্তর আফ্রিকার স্থপতি। উসমানীয়দের সুসংগঠিত নৌ-শক্তি এবং সাদীদের দুর্ধর্ষ স্থলবাহিনীর বীরত্ব—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আফ্রিকা মহাদেশের এই অংশটি দীর্ঘকাল তার ইসলামি স্বকীয়তা বজায় রাখতে পেরেছিল।
৬.মধ্যপ্রাচ্যের বিভক্তি ও ভূ-রাজনীতির উত্তরোণের সম্ভাব্য দ্বার।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলিম দেশগুলোর এই অনৈক্য ও পশ্চিমা নির্ভরতা তাদের বৈশ্বিক প্রভাবকে খর্ব করছে। এই পরিস্থিতির মূল কারণগুলো হলো।
১.দীর্ঘদিনের রাজতন্ত্রের বিলাসী ক্ষমতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আ্যামেরিকার পদলেহন যা আজ নিজেদের অস্তিত্বের শেষ প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। এতগুলো দেশ সৌদি আরব,সংযুক্ত আরব আমিরাত,বাহরাইন,কুয়েত,জর্ডান,মিশর,তুরস্ক,আজারবাইজান সাবাই একসাথে অ্যামেরিকার গোলামী ছেড়ে দিলে পুরো বিশ্ব মুসলিম দেশগুলোর কাছে মাথা নোয়াবে।
২.অর্থনৈতিক স্বার্থ বনাম আদর্শ: অনেক দেশ তাদের অর্থনীতিকে পশ্চিমা বাজারের সাথে যুক্ত করে ফেলেছে। ফলে যে আক্বিদাগত বিরোধ নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ইরানের বিপক্ষে অবস্থান ছিলো এই দেশগুলো ক্ষমতা আর অর্থনৈতিক প্রভাবকে ধরে রাখার জন্য তারা এখন সেটাও হারাতে বসেছে।
৩.প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষত: ইয়েমেন, সিরিয়া বা লেবাননে ইরান ও সৌদি জোটের যে লড়াই, তা আসলে কোনো পক্ষেরই জয় নিশ্চিত করেনি; বরং মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ও জীবন ক্ষয় করেছে। এই বিভাজনই তৃতীয় শক্তিকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়।নিজেদের এই অনৈক্য এবং দ্বন্দ্বের ফলে তাদের পররাষ্ট্রনীতি মূলত নিরাপত্তা বনাম সার্বভৌমত্ব—এই দোটানায় বন্দি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উচিত তাদের "নিরাপত্তা আমদানির" নীতি থেকে বেরিয়ে এসে "আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট" গঠন করা। নিজেদের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে ফেললে বাইরের শক্তির খবরদারি করার সুযোগ এমনিতেই হারিয়ে যাবে।
যেমনটা ১৫০০-১৭০০ পর্যন্ত উসমানীয় এবং সাদী রাজবংশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা নিজেদের মাঝে দীর্ঘ লড়াই এবং অনৈক্যর দ্বার বন্ধ করে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিকে রুখে দিয়েছিলো। তাদের এই ঐক্যবল উত্তর আফ্রিকা এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর রক্ষক হিসেবে কাজ করেনি, বরং এই অঞ্চলকে ইউরোপীয় শক্তির সরাসরি দখলদারিত্ব থেকে প্রায় ৩০০ বছর দূরে রেখেছিল।
তাত্বিক বিশ্লেষণ : তোফায়েল আহমাদ

0 মন্তব্যসমূহ